
মোহাম্মদ আশরাফুল আলম খান
৭ নভেম্বর, ১৯৭৫ ইতিহাসে সিপাহী – জনতার বিপ্লব হিসেবে খ্যাত। বিগত শতকের সত্তরের দশকের মধ্যভাগে দেশ ও সামরিক বাহিনী ধ্বংসের যে গভীর ষড়যন্ত্র হয়েছিল, দেশপ্রেমিক সিপাহী ও জনতা তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে পাল্টা বিপ্লবের মাধ্যমে সে সব ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দেন। একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে বুঝা যায় -এটাই ছিল বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ এর প্রথম পদক্ষেপ। ১৯৭৫ সালের ৩রা নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে যে ক্যু ঘটে, তা ছিল রক্তপাতহীন। ক্যু করে তিনি প্রচার করছিলেন যে প্রেসিডেন্ট মুজিবকে স্বপরিবারে হত্যা ও সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড ফিরিয়ে আনতে তিনি এ পদক্ষেপ নেন। কিন্তু দুদিনের মধ্যেই প্রমান হয়ে যায় যে তিনি সেনাপ্রধান হতে যতটা তৎপর, খুনিদের দমনে ঠিক ততটা তৎপর নন। মূলত খালেদ মোশাররফ ১৫ আগস্টের ঘটনার বেনিফিট নিতে না পারার ক্ষোভ হিসেবে পাল্টা ক্যু করেন। ১৫ আগষ্টে কর্নেল ফারুক যে গোলাশূণ্য ট্যাংক নিয়ে ক্যু ঘটায়, পরবর্তীতে সেই গোলাশূণ্য ট্যাংক ও কামানের গোলা সরবরাহের নির্দেশ দেন তৎকালীন সেনাবাহিনীর সিজিএস ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ। সেনাবাহিনীর বেঙ্গল ল্যান্সার ও ২ ফিল্ড আর্টিলারি নামক মাত্র দুটি ইউনিট হত্যাকাÐের সাথে জড়িত হলেও তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল কাজী মুহাম্মদ শফিউল্লাহ তাদের দমনের ব্যবস্থা না করে প্রেসিডেন্টকে কোনক্রমে বাসা হতে বেরোনো যায় কি না সেই পরামর্শ দেন। ঐসময়ে শক্তিশালী ৪৬ ইন্ডিপেন্ডেন্ট ব্রিগেড কমান্ডার কর্নেল শাফায়াত জামিল। তিনি ব্যক্তিগতভাবে প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিবের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সেনাপ্রধানের অর্ডার ব্যতীত তিনি উদ্ভুত পরিস্থিতিতে সেনা মুভ করানোর ক্ষমতাপ্রাপ্ত ছিলেন। কিন্তু রহস্যজনক কারণে তিনি বিদ্রোহ দমনের কোন ব্যবস্থা নেননি। আফটার অল বিদ্রোহীরা ছিল তার কমান্ডের অধীনে। ১৫ আগস্ট সারাদিন শাফায়াত জামিল খোশমেজাজে ছিলেন এবং কর্নেল হামিদকে বলেছিলেন, “দেখলেন স্যার, ফ্রিডম ফাইটার্স হ্যাভ ডান ইট বিফোর, এন্ড দে হ্যাভ ডান ইট এগেইন”।
সেসময় সেনাবাহিনীতে নানা মত, নানা গ্রæপ থাকলেও সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান ছিলেন সকল কিছুর উর্ধ্বে। মুজিব হত্যাকাÐ পরবর্তী সময়ে জিয়া সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ পদে থেকেও ছিলেন অসহায়। সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে সিনিয়র অফিসারগণ তাঁকে অসহযোগিতা করতে থাকেন। তিনিও একক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রাখতেন না। ধুরন্ধর খন্দকার মোশতাক খুব ভাল করেই জানতেন, জিয়াউর রহমান তাকে খুব একটা পছন্দ করেন না। তাই তিনি সেনাপ্রধানের ক্ষমতা খর্ব করতে সেনাপ্রধানের উপরে চীফ অব ডিফেন্স স্টাফ হিসেবে মেজর জেনারেল খলিলুর রহমানকে এবং ডিফেন্স অ্যাডভাইজর হিসেবে জেনারেল (অবঃ) ওসমানীকে বসান। ৩রা নভেম্বর ক্যু এর মাধ্যমে খালেদ মোশাররফ গং যখন বঙ্গভবনে ক্ষমতার ভাগাভাগি নিয়ে ব্যস্ত তখন সেনানিবাসের ভেতরে যে চাপা উত্তেজনা চলছিল তা তারা টের পেতে ব্যর্থ হন। ৭ নভেম্বর বিপ্লবের মাধ্যমে খালেদ মোশাররফের ক্যু ব্যর্থ হওয়ার পাশাপাশি সে সময়ের বিরোধীদল জাসদ নেতা কর্নেল (অবঃ) তাহেরের পরিকল্পনাও ব্যর্থ হয়ে যায়।
৩রা নভেম্বর ক্যু এর পর সেনানিবাসে জাসদের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা নানা অপতৎপরতা চালাতে থাকে। তারা সেনানিবাসে লিফলেট বিতরণ করে সাধারণ সৈনিকদের উত্তেজিত করতে থাকে। অন্যদিকে পেশাদার সৈনিকরা তখন সেনাবাহিনী ও দেশ রক্ষার চিন্তা করছিল। তাদের সেই চিন্তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করার মাধ্যমে। ৪র্থ বেঙ্গলের সিও কর্নেল আমিনুল হক ছিলেন যুদ্ধকালীন সময়ে জিয়াউর রহমানের বিশ্বস্ত সঙ্গী। তিনি, বেঙ্গলে ল্যান্সারের মেজর মহিউদ্দিন ও তাজ উদ্দিন আহমেদের জামাই ক্যাপ্টেন মুনির দেশপ্রেমিক বিশ্বস্ত সৈনিকদের নিয়ে সেনাপ্রধানের বাসায় যান। তাদের দেখেই সেখানে প্রহরারত ১ম বেঙ্গলের গার্ডরা পালিয়ে যায়। সৈনিকরা সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে কাঁধে নিয়ে বাংলাদেশ-জিন্দাবাদ, জিয়াউর রহমান-জিন্দাবাদ শ্লোগান দিতে দিতে ৪র্থ বেঙ্গলের সিও অফিসে নিয়ে আসেন। এই সংবাদ যখন বঙ্গভবনে খালেদ মোশাররফ গংয়ের কাছে এবং এলিফ্যান্ট রোডে তাহের গংয়ের কাছে পৌঁছায় তখন যুগপৎভাবেই তাদের স্বপ্নভঙ্গ হয়।
১৯৪৭ হতে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত পুর্ব পাকিস্তানে যে ভাষা ভিত্তিক জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটে তা ১৯৭১ এর পর আবেদন হারিয়ে ফেলে। আবার যে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ পাকিস্তান আন্দোলন করেছিল, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে সেই ধর্মীয় জাতীয়তাবাদেরও অবসান ঘটে। দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন ছিল একটি রাষ্ট্র ভিত্তিক জাতীয়তাবাদ ও নতুন আত্মপরিচয়ের যা স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগ সরকার দিতে ব্যর্থ হয়। এসময় দেশপ্রেমিক বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা চিন্তা করতে থাকেন কাকে দিয়ে, কিভাবে এই সংকট মোকাবেলা করা যায়। ৭ নভেম্বর জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধান হিসেবে পুনঃবহাল হলেও প্রেসিডেন্ট থেকে যান বিচারপতি সায়েম। সামরিক আইনও জারি থাকে। শেখ মুজিব হত্যার পরেই যে দলের নেতারা দলের প্রধান ও তার পরিবারের লাশ কবরে নামানোর আগে মন্ত্রীসভায় যোগদান করে ; সাধারণ জনগণ তাদের আর আস্থায় নিতে পারেনি। ১৯৭২-৭৫ পর্যন্ত ছিল মানুষের স্বপ্ন ভঙ্গের ইতিহাস। যে আশা, যে স্বপ্ন নিয়ে মানুষ দেশ স্বাধীন করেছিল, জীবন দিয়েছিল ; স্বাধীন দেশে তা বাস্তবায়িত হয়নি। তারা আবার একদলীয় শাসন, অত্যাচার, দুর্নীতি, কণ্ঠরোধ, লুটপাট দেখেন। দেখেন গুম ও খুন। আর মানুষ সবচাইতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় দুর্ভিক্ষে।
দেশের মানুষ ও দেশপ্রেমিক সৈনিকেরা এসব ক্ষমতালোভী, সুবিধাবাদী নেতাদের উপর বীতশ্রদ্ধ হয়। তারা পাকিস্তানপন্থী কিংবা ভারতপন্থী কাউকেই আর ক্ষমতায় দেখতে চাচ্ছিলেন না। প্রত্যাশা করেছিলেন একজন সাচ্চা দেশপ্রেমিক বাংলাদেশপন্থী নেতা যিনি রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা করবেন, স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি গ্রহন করবেন, মুসলিম ও বন্ধুপ্রতিম দেশের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন করবেন, মানুষের মৌলিক অধিকার বাস্তবায়নের চেষ্টা করবেন, অর্থনৈতিক মুক্তি আনতে সচেষ্ট হবেন, দূর্নীতি রোধ করবেন, সামাজিক নিরাপত্তা প্রদান করবেন এবং সর্বোপরি সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে যাবেন। ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র হতে স্বাধীনতা ঘোষণার জন্য জিয়াউর রহমানের পরিচিতি এবং জনপ্রিয়তা ছিল সর্বস্তরে। এরপর মুক্তিযুদ্ধে সাহস, বীরত্ব আর নেতৃত্ব দিয়ে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান। শোষণ-বঞ্চনা থেকে মুক্ত হওয়া এবং স্বাধীনতার প্রত্যাশিত চাহিদা পূরণের জন্য অপেক্ষায় থাকা জনগণ ৭ নভেম্বরে জিয়াউর রহমানের নব উত্থানের মাধ্যমে নতুন দিশা লাভ করে।
১৯ দফা কর্মসূচি, উৎপাদনমুখী রাজনীতি আর বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে জিয়াউর রহমান তাঁর সততা ও দেশপ্রেমের মাধ্যমে দেশ গঠনে ব্রতী হন। এদেশের জনগণ তাঁর রাজনৈতিক দর্শনকে দারুনভাবে গ্রহণ করেন। ৭ নভেম্বরের স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য পরবর্তীকালে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়। সেই ধারাবাহিকতা চলে ২০০৭ পর্যন্ত। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের পরাজিত শক্তি ১/১১ তে অনির্বাচিত অসাংবিধানিক জবরদস্তির সরকার প্রতিষ্ঠার ভিতর দিয়ে ৭ নভেম্বরের ছুটি বাতিল করে। শুরু হয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিরোধী হীন চক্রান্ত। ভিনদেশী গোয়েন্দা সংস্থা প্রকাশ্যে বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ শুরু করে। সাম্রাজ্যবাদী ও সম্প্রসারণবাদী দেশের রাষ্ট্রদূতরা বাংলাদেশের নির্বাচনসহ নানা বিষয়ে কূটনৈতিক শিষ্টাচার বহির্ভূত আচরণ করতে থাকে। তথাকথিত ১/১১ পরবর্তী বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে বিদেশী হস্তক্ষেপের মাধ্যমে মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে জনসমর্থনহীন নতজানু সরকার কায়েম করা হয়। ফলে দেশ থেকে রাজনৈতিক শিষ্টাচার বিলুপ্ত হয়ে যায়। নানাভাবে দূর্নীতিবাজদের আশ্রয় প্রশ্রয় দেয়া হয়। মানুষের কষ্টকে উপহাস করা হয়। সুপরিকল্পিতভাবে রাষ্ট্রীয় সকল প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে দেয়া হয়। দেশে স্বাধীন মতপ্রকাশ বন্ধ হয়ে যায়। গণমাধ্যমের কন্ঠ রোধ করা হয়। মানুষের মৌলিক চাহিদাকে উপেক্ষা করা হয়। বিরোধীমত দমনে মরিয়া অবৈধ সরকার বিনা বিচারে হত্যা, গুম, মামলা, হামলা চালাতে থাকে। এ যেন আমাদের স্বাধীনতা পরবর্তী পরিস্থিতিকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। ৭ নভেম্বরের মাধ্যমেই দেশ একদলীয় শাসন ব্যবস্থা হতে গণতান্ত্রিক পথে প্রবেশ করে, বিরোধী প্রতিপক্ষকে গুম ও হত্যার সংষ্কৃতি বিলোপ করে। জনমত ও মুক্ত সাংবাদিকতার পথ বিকশিত করে। সর্বোপরি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব হরনের যে নীল নকশা ছিল তা নস্যাৎ করে দেয়। একমাত্র জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের চেতনায় বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের আদর্শে দেশকে ফিরিয়ে আনতে পারলেই চলমান সৃষ্ট চরম সংকট থেকে রাষ্ট্র মুক্তি পাবে। এটি নিঃসন্দেহে আমরা বলতে পারি। জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস জিন্দাবাদ।
লেখকঃ ইতিহাস গবেষক