
ড. মারুফ মল্লিক
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানী বাহিনীর অতর্কিত হামলায় যখন সারা দেশের মানুষ বিপর্যস্ত, কোনঠাসা, হতবিহব্বল, দিশেহারা তখনই একটি কণ্ঠস্বর ভেসে আসলো আমি মেজর জিয়া বলছি, বাংলাদশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি। একটি ঘোষণা, একটি কণ্ঠস্বরের দৃঢ়তা বদলে দিলো পুরো দৃশ্যপট। দিকে দিকে সংগঠিত হতে শুরু করলো মুক্তিযোদ্ধারা। এরপর পাল্টা প্রতিরোধের ইতিহাস। স্বাধীনতাকামী একটি জাতির ঘুরে দাড়ানোর গল্প। স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্য মরণপন লড়াই। স্বাধীনতার ওই লাল সূর্যটাকে ছিনিয়ে আনার জন্য রক্তের শেষ বিন্দু দিয়ে যুদ্ধের ময়দানে টিকে থাকা। এসবের মূলে ছিল জিয়াউর রহমানের ওই স্বাধীনতার ঘোষণা। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার ইতিহাসে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান অবিস্মরনীয় এক চরিত্র।
কার্যত জিয়াউর রহমান আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যতম কেন্দ্রীয় সামরিক চরিত্র। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ চট্টগ্রামের কালুর ঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। তার ভাষনটি সারা দেশেই প্রচারিত হয়। মেজর জিয়ার ভাষণ শুনেই দেশবাসী বুঝতে পারে স্বাধীনতার যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। এই ভাষণ জনসাধারণকে ব্যপকভাবে আলোড়িত, উদ্বেলিত ও আশান্বিত করে। সারাদেশে স্ফুলিঙ্গের মত জিয়ার ঘোষনার প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। দিক নির্দেশনাহীন আক্রান্ত জাতি নিজেদের সংগঠিত করে পাকিস্তানী বর্বর আক্রমনের বিরুদ্ধে পাল্টা আক্রমনের প্রস্তুতি নেয়। সংঘবদ্ধ হয়ে ঘুরে দাড়ায় নাগরিক সমাজ। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গড়ে উঠে প্রশিক্ষণ শিবির। বেতারের ঘোষণা জিয়াকে ভিন্ন পরিচয় গঠনে সহায়তা করছিল।
২৫ মার্চের কাল রাত্রির হত্যাযজ্ঞের পর পাকিস্তানী শাসকরা সম্ভবত রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক কোনো প্রতিক্রিয়া আমরা লক্ষ্য করি না। বরং আক্রান্ত জাতিকে যুদ্ধের ময়দানে অস্ত্রের মুখে ফেলে দিয়ে রাজনৈতিক নেতারা নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ব্যস্ত ছিলেন। কিন্তু সামরিক জিয়াউর রহমান দৃঢ় প্রত্যয়ে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে সন্মুখ যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েন। বেতারে ঘোষনার অন্যান্য বাঙালি সামরিক কর্মকর্তা ও সৈনিকরা সংগঠিত হয় এবং যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। মানব ইতিহাসে শুরু হয় গেরিলা যুদ্ধের নতুন এক অধ্যায়। ১৯৭১ সালের কাছাকাছি সময়ে আলজেরিয়া ও লিবিয়ার গেরিলা যুদ্ধারা উপিিনবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে দেশ স্বাধীন করেছিল। আমাদের গেরিলারাও নতুন ইতিহাস নির্মানের পথে এগিয়ে যান। জিয়া এই ঐতিহাসিক লড়াইয়ের অন্যতম যোদ্ধা ও নেতা।
মুক্তিযোদ্ধারা সবাই যার যার অবস্থান থেকে মুক্তিযুদ্ধে অবদান রেখেছেন। তবে বেতারের ঘোষনা মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে জিয়াউর রহমানকে এগিয়ে দিয়েছে অনেকটাই। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব যতদিন অক্ষুন্ন থাকবে ততদিন মানুষও এক মেজরের কন্ঠস্বরকে মনে রাখবে, আমি মেজর জিয়া বলছি। নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে দাড়িয়ে বিদ্রোহী হতে অমিত তেজ ও সাহসের প্রয়োজন হয়। এই পরিস্থিতিতে যারা বিদ্রোহ করতে পারেন, জনতাকে সংঘবন্ধ হতে উৎসাহিত করেন তারা ইতিহাসের পাতায় টিকে যান। জিয়াউর রহমান বাংলার ইতিহাসে তেমনই এক অনবদ্য চরিত্র।
জিয়াউর রহমান সম্মুখ সমরে অংশ নেওয়া রনাঙ্গনের সৈনিক। সৈনিক হিসাবে তিনি বিদ্রোহ করেছিলেন। জিয়াউর রহমানের সামনে দুটো পথ খোলা ছিল। হয় দেশ স্বাধীন করা। না হয় সামরিক আদালতে বিচারের মুখোমুখি হওয়া বিদ্রোহের দায়ে। সময় সাহসীদের সঙ্গে থাকে। ইতিহাসের নায়করা কখনো শোষকদের সঙ্গে আপস করেন না। তারা জনতার কাতারে দাঁড়িয়ে যান অধিকার আদায়ের দাবী নিয়ে। তারা সময়কে ধারণ করেন। বুঝতে পারেন। জিয়াউর রহমান ১৯৭১ সালে জনআকাংখা অনুধাবন করতে পেরেছিলে স্পষ্টভাবে। চাপ ও সাজার ভয়কে উপেক্ষা করে তিনি জনআকাংখা বাস্তবায়নের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। ফলে যে সাহসের উপর ভর করে মেজর জিয়া স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন তার উপর তিনি নিজেই আস্থা রাখলেন। সারা দেশের মানুষ জিয়াউর রহমানের বেতার ভাষনের উপর আস্থা রেখে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। দেশের মানুষের সম্মিলিত সাহসের উপর ভর করেই দেশ স্বাধীন হলো।
কিন্তু পলাতক ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের সময়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির প্রবনতা লক্ষ্য করা যায়। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে এটাই প্রমানিত হয় যে আওয়ামী লীগ নানা ভাবে সম্মুখ সমরে নেতৃত্ব দেওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে হেয় ও ব্রিবত করার চেষ্টা করেছেন। জিয়াউর রহমানের মুক্তিযুদ্ধের খেতাব ও স্বাধীনতা পদক বাতিল করেছিল আওয়ামী লীগ। মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম এ জি ওসমানি বা এয়ার ভাইস মার্শাল একে খন্দকার ও আওয়ামী লীগের কুটিল রাজনীতি থেকে রক্ষা পাননি।
মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাসকে অস্বীকার করার প্রবনতা থেকেই আওয়ামী লীগ এ ধরনের ন্যক্কারজনক কাজে লিপ্ত হয়েছে। বরাবরই তারা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের আড়াল করার চেষ্টা করেছে। সম্ভবত এটা ভারতীয় প্রকল্প ছিল যা আওয়ামী লীগ বাস্তবায়ন করেছে। আওয়ামী লীগের মূল উদ্দেশ্য ছিল ক্ষমতা কুক্ষিগত করে এই দেশকে ভারতের অনুগত করে রাখা। তাই ১৯৭১ সালের পর একদলীয় বাকশাল গঠন করে দেশে ফ্যাসিবাদ কায়েম করেছিল। ২০০৮ সালের পর আওয়ামী লীগ দেশে একদলীয় ফ্যাসিবাদের শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিল।
কিন্তু ফ্যাসিবাদী শাসন দিয়ে সাময়িক নিয়ন্ত্রন করা গেলেও ইতিহাসের নায়ককে আড়াল করে রাখা যায় না। স্বাধীনতার ঘোষক হিসাবে জিয়াউর রহমান সর্বজন স্বীকৃত। সারা দেশের মানুষ শুনছে। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান সরাসরি স্বাধীনরতার ঘোষণা দিয়েছেন এমন কেউ শুনেননি। এ ধরনের কোনো প্রমানও নেই। বলা যায় মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এক ধরনের হীনমন্যতার কারণে আওয়ামী লীগ বরাবরই ইতিহাসকে বিকৃত করার চেষ্টা করেছে। বিকৃত ইতিহাসকে এদেশের মানুষ ২৪ এর আগস্টে দুমড়ে মুচড়ে প্রত্যাখান করেছেন। ২৪ এর বিপ্লবে আমরা জিয়াউর রহমানের সেই তেজ ও সাহসের প্রতিফলন দেখতে পাই। মাথা না নোয়ানোর সেই দৃঢ়তা দেখতে পাই। জিয়াউর রহমানের বহুপক্ষীয়, অর্ন্তভূক্তিমূলক রাজনীতিই ছিল ২৪ এর গনবিপ্লবের অন্যতম চালিকা শক্তি। জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শন প্রবলভাবে ২৪ এর বিপ্লবে প্রভাব বিস্তার করেছে। আর দেশের প্রতি জিয়াউর রহমানের ভালোবাসা ও আত্ম নিবেদন ২৪ এর আন্দোলনকে শক্তি দিয়েছে। জিয়াউর রহমনাসহ লাখো মুক্তিযোদ্ধা ১৯৭১ সালে পিছু হটেননি। নানা শংকা, মৃত্যুভয়কে উপেক্ষা করেই স্বাধীনতার লাল টকটকে সূর্যটাকে ছিনিয়ে হাতে নিয়েই তবে বাড়ি ফিরেছেন। ২৪ এর নায়কদেরও নানা চাপ ও প্রলোভনে টলানো যায়নি। তাদেরও প্রানহানীর শঙ্কা ছিল। ছিল পদে পদে বিপদের হাতছানি। কিন্তু ইস্পাত কঠিন ঐক্য ও দৃঢ় অবস্থানের কারণে শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগ দেশ ফেড়ে ভারতে পালিতে যেতে বাধ্য হয়। আরো একবার তারা ভারতে পালিয়েছিল। সেটা ১৯৭১ সালে। নিরস্ত্র স্বাধীনতাকামী জনতাকে সুসংগঠিত না করে অস্ত্রের মুখে ফেলে দিয়ে দলে দলে ভারতে পালিয়ে গিয়েছিল। তাদের কেউ রুখে দাড়ায়নি।
আওয়ামী লীগের কেউই বলেনি উই রিভোল্ট। কিন্তু চট্টগ্রাম থেকে ভেসে আসলো জিয়াউর রহমানের কন্ঠ উই রিভোল্ট। এই কণ্ঠস্বর স্ফুলিঙ্গে মত অনুপ্রেরনার শক্তি হিসাবে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়লো। ইতিহাস তার কারেক্টনেস রক্ষায় বড়ই নির্মম। নির্মম এই অর্থে যে নানাভাবে বিকৃত করার চেষ্টা করা হলেও ইতিহাস যোগ্য নায়ককে যথাস্থানে পৌঁছে দেয়। তাই বাংলাদেশের ইতিহাস পাঠে জিয়াউর রহমান নিজের জায়গা করে নিয়েছেন একজন দক্ষ সময় নায়ক, যোগ্য শাসক, সর্বোপরি নিরন্তর অনুপ্রেরনার এক নিরন্তর উৎস হিসাবে। তিনি দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় অনুপ্রেরণার এক উজ্জল বাতিঘর। ১৯৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধ বা ২৪ এর গনবিপ্লব দুই সময়ই জিয়াউর রহমান সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
আমাদের মুক্তিযুদ্ধে জিয়াউর রহমান এক অসম্ভব অনুপ্রেরণাদায়ী চরিত্র। একই সঙ্গে তিনি সাধারণ জনতা ও সামরিক বাহিনীর সদস্যদের যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য অনুপ্রানিত করতে সফল হয়েছিলেন। এটা জিয়াউর রহমানের বেতার ঘোষণা ও অত্যন্ত দক্ষ নেতৃত্বগুনের কারণেই সম্ভব হয়েছিল।
লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক, শিক্ষক, ডয়েচেভেলে একাডেমি, জার্মানি।