Address
    28, 1 VIP Rd, Dhaka 1000
    Bangladesh
    Follow us
    Follow us

    Ziaur Rahman Archive

    স্বাধীনতা ঘোষণার ময়নাতদন্ত

    পাকিস্তান কেন ভেঙে গেল?

    ব্রিটিশরা কাউকে শাসন করে, কাউকে ভয় দেখিয়ে, কাউকে টাকা দিয়ে কিনে ও কাউকে সম্মান করে ভারতবর্ষের মোটামুটি তিনটা প্রজন্মকে শাসন করেছিল। মোটাদাগে ‘শাসন আর ব্যাপারীগিরিই’ ছিল তাদের বেসিক পলিসি। ব্রিটিশদের শেখানো পথে ভারত হাঁটতে গিয়ে হয়ে উঠল ফ্যাসিবাদী, সাম্রাজ্যবাদী ও স্বৈরাচারমূলক বাসনার এক ভয়ানক ক্রীড়ানক। ভারতের সেই আগ্রাসী বাসনা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য মুসলমানরা ব্রিটিশদের কাছে ‘স্বাধীন তিনটি স্টেট’ করার জন্য ১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাব দেয়। স্বাধীন তিনটি দেশের ভেতর একটি হবে ‘হিন্দু’ অধ্যুষিত রাষ্ট্র ও বাকী ২টি হবে ‘মুসলমান’ সংখ্যা গরিষ্ঠতার ভিত্তিতে। অর্থাৎ হিন্দু ও মুসলিম জাতিগুষ্ঠির জন্য পৃথক দেশ চায় তারা, কোনো ধর্মভিত্তিক নয়। অথচ ব্রিটিশ ও ভারতীয়রা অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগষ্ট ‘অখন্ড’ ভারত হতে শুধু ইসলাম ধর্মকে বেইস করে অস্বাভাবিক রাষ্ট্র পাকিস্তানের জন্ম দেয়, ভারত যাতে পাকিস্তানের বিপক্ষে সহজেই অমুসলিম ইস্যুতে ট্রাম্পকার্ড চালাতে পারে। পাশাপাশি এই অখন্ড পাকিস্তানে ছিল পাঞ্জাবী, বেলুচ, সিন্ধি, পশতু ও বাঙালি জাতিগুষ্ঠি। এসব জাতিগুষ্ঠির মধ্যে বাঙালি সম্প্রদায় পুরো পূর্ব পাকিস্তানে বাস করত, যে অঞ্চলটি আবার রাজধানী লাহোর হতে প্রায় বারোশ মাইল দুরে অবস্থিত এবং যার ভারতের সাথে প্রায় ২৪৭ কিলোমিটারের স্থল যোগাযোগ রয়েছে। এরকম দেশভাগ বা ভারত ভাঁটোয়ারার মধ্যেই লুকানো ছিল ‘এক রাষ্ট্রে বসিয়া অন্যটির শাসন’ করিবার অভিপ্রায়। প্রসঙ্গত এত দুরে থেকেও ম্যাক্সিমাম বাঙালি মুসলমান ঐ সময়ে পাকিস্তান সৃষ্টির আন্দোলন-সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। কারন বাঙালিরা ভেবেছিল ভারতের ফ্যাসিবাদী, সাম্রাজ্যবাদী ও স্বৈরাচারমূলক আচরনের পরিবর্তে পাকিস্তান হয়তো তাদের উপহার দিবে সাম্যবাদী, ভ্রাতৃত্বমূলক ও গনতান্ত্রিক পরিবেশ। কিন্তু পরিতাপের বিষয় পাকিস্তান পৌনে ২০০ বছরের ব্রিটিশদের ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ পলিসি বা ভারতের সাম্রাজ্যবাদের পরিণতি থেকে ন্যূনতম শিক্ষা নেয়নি। বরং পাকিস্তানের শাসকরা চালু করলো সাম্রাজ্যবাদের নতুন থিউরী ‘করিডোর’ নীতি বাস্তবায়ন, আঞ্চলিক বৈষম্য ঝিইয়ে রাখা, মানবাধিকারহীন রাখা, ইনসাফ বিহীন সমাজ কায়েম করা এবং সকল অধিকারের ‘মা’ গনতন্ত্রকে টুঁটি চেপে ধরে রাখা। এসব আগ্রাসী কর্মকান্ড পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকেরা প্রথমেই পূর্ব পাকিস্তানের আপামর জনসাধারনের উপর প্রয়োগ শুরু করে। শুরুতেই ‘বাঙালিকে নিকৃষ্ঠ জাতি হিসেবে ট্রিট’ করার জন্য স্কুলের পাঠ্যবই, বাসাবাড়ি, হোটেল-রেস্তোরায়, সামাজিক আড্ডায়, সংবাদপত্রে, প্রচার মাধ্যমে, সরকারী অনুষ্ঠানে বিশেষ করে কর্মচারী, সেনাবাহিনী ও আমলাদের মিলনমেলায় আলোচনার বিষয়বস্তু সেট-আপ করে। এরপর তাঁরা বাঙালিদের দাবাইয়া রাখার মিশনে নেমে পড়ে। দাবাইয়া রাখার প্রথম এসিড লিটমাস পেপার হিসেবে পূর্ব বাংলায় ‘উর্দুকে’ রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেয়ার ষড়যন্ত্র করে। পুরো পূর্ব পাকিস্তান ঐক্যবদ্ধ হয়ে সেই ঘৃন্য চক্রান্ত রুখে দিয়ে ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারীতে রাষ্ট্রভাষা বাংলা প্রতিষ্ঠিত করে। ভাষা আন্দোলনের ভিতর দিয়ে জনগনের মধ্যে গড়ে উঠা ইস্পাত-কঠিন ঐক্যের ফল ছিল ১৯৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠন, যা ছিল দৃশ্যত বাঙালির প্রথম রাজনৈতিক বিজয়। পঞ্চাশের দশকে পূর্ব পাকিস্তানের নেতারা পশ্চিম পাকিস্তান শাসন করবে তা কোনো ইক্যুয়েশনে মানতে নারাজ তৎকালীন পাকিস্তানি সরকার। ফলশ্রুতিতে ১৯৫৮ সালে এসে পাকিস্তানের রাজনীতির অন্দর মহলে প্রবেশ করে সামরিক বাহিনী। তাঁরা এসেই সমস্ত মিটিং, মিছিল, সভা-সমাবেশ ও দলীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। ফলে স্বাভাবিক রাজনীতি করার অধিকার হারায় জনগন। পূর্ব পাকিস্তানকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্্েরফ একটা করিডোর হিসেবে গন্য করে তাদের জনগনের জন্য সীমিত শিক্ষা, চাকুরী, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য অধিকারের কর্মপ্রয়াস চালু রাখে। পূর্ব পাকিস্তানের জনগন বুঝল তারা ‘খাল কেটে কুমির’ এনেছে এবং সেই কুমির একটা আপাদমস্তক প্রতারক, মিথ্যাবাদী ও ছলনাময়ী। তাই ’৬২ সালের পর থেকে এ বাংলার জনগন আস্তে আস্তে সরকারের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠতে লাগল এবং রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে অবতীর্ণ হলো। পূর্ব বাংলার জনগনের মোটা চালের অধিকার, ভোটের অধিকার, স্বাধীনভাবে কথা বলা ও মতামত প্রকাশের অধিকার এবং ন্যায় বিচারের গ্যারান্টি প্রদান ইত্যাদি আদায়ের জন্য তৎসময়ের শক্তিশালী রাজনৈতিক প্লাটফর্ম আওয়ামী লীগের নেতা শেখ মুজিব ছিলেন সবার আগে। তিনি পাকিস্তান সৃষ্টি ও পাকিস্তানের ভেতরে থেকে লড়াই করতে গিয়ে জেল-জুলুম-নির্যাতন-নিপীড়ন-হামলা-মামলা অনেক সহ্য করেছেন। এসব করতে গিয়ে তিনি বহুবার জেল খেটেছেন। তাই ’৬৬ এর ছয় দফা, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা ও ’৬৯-এর গনঅভ্যুত্থান শেখ মুজিবুর রহমানকে পূর্ব পাকিস্তানের আনপ্যারালাল নেতা তৈরি করে ফেলে। ১৯৬৯ সালের অভ্যুত্থান পরবর্তী ১৯৭০ সালটি ছিল পাকিস্তান এক থাকবে, না ভেঙ্গে যাবে, তার নির্ধারক সময়কাল। তারই বহি:প্রকাশ ’৭০ এর নির্বাচনের ‘ফলাফল’ যা সত্যিকার অর্থে ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের হাত থেকে বের হয়ে যাওয়ার ‘ট্রাম্পকার্ড’। কিন্তু শেখ সাহেবের কাছে পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র সৃষ্টির চেয়ে প্রিয় ছিল ‘হামারি জান’ পাকিস্তানের কাঠামোর ভেতরে থেকে ‘স্বায়ত্বশাসন’ আদায় অথবা নিদেনপক্ষে সমগ্র পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়া। শেখ মুজিব জানতেন যে ‘দ্বিতীয় অপশনটি’ কোনোদিনই পাকিস্তান মেনে নেবে না কারন যুক্তফ্রন্টের সরকারের আয়ু ছিল মাত্র ৭৬ দিন। প্রথম অপশনটির আপসরফার জন্যই সামরিক শাসক ইয়াহিয়ার সাথে শেখ মুজিবের ১৫-২০ মার্চ পর্যন্ত আলোচনা চলে এবং ২১ মার্চ ইয়াহিয়া, জুলফিকার আলী ভুট্টো ও মুজিবের বৈঠক হয়। এরপর আর শেখ মুজিবের সাথে ইয়াহিয়ার কোনো বৈঠক হয়নি। ২৪ মার্চ সন্ধ্যা ছয়টায় শেখ মুজিবের পক্ষ থেকে ইয়াহিয়ার উপদেষ্টা বিচারপতি কর্নেলিয়াসের কাছে প্রস্তাব ছিল দেশের নাম হবে ‘কনফেডারেশন অব পাকিস্তান’। ইয়াহিয়ার উপদেষ্টা বিচারপতি কর্নেলিয়াস কনফেডারেশনের স্থলে ‘ইউনিয়ন’ রাখার প্রস্তাব করেছিল যা আওয়ামী লীগের পছন্দ হয়নি (১৯৭১- কলকাতা কোন্দল, পৃষ্ঠা: ৪৬)। এরপর শেখ মুজিব ২৫ মার্চ সন্ধ্যা পর্যন্ত ইয়াহিয়ার তরফ থেকে ঘোষণার অপেক্ষায় রইলেন। ঘোষণাটি আসেনি। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরু করার সিদ্ধান্ত দিয়ে ২৫ মার্চ রাতে ইসলামাবাদে ফিরে যান। শেখ মুজিব জানতেন পাকিস্তানিরা আপাদমস্তক প্রতারক এবং মাথা মোটা-ঘাড় তেড়া জাতি। তিনি এটাও জানতেন যে এসব আলোচনা কালক্ষেপন করার প্রয়াস এবং পাকিস্তানিরা সামরিক শক্তি প্রয়োগ করবে। তাই এটা বলা অনুচিত হবে না যে, শেখ মুজিব নিজেই পাকিস্তানি বাহিনীকে প্রস্তুতি নিতে, শক্তি বৃদ্ধি করতে, বিহারীদের অস্ত্র দিয়ে প্রশিক্ষন দিতে এবং প্রশিক্ষিত ও দুর্ধর্ষ বাঙ্গালি গেরিলা কমান্ডো বাহিনীকে সরিয়ে সেখানে পাকিস্তানি অফিসার যোগান বাড়াতে সহায়তা করেছেন। ফলে পাকিস্তানি সৈন্যরা যে ২৫ মার্চ রাতে হামলা চালাবে, সে খবর শেখ সাহেব জানতেন। তিনি তাঁর রাজনৈতিক সহকর্মীদের কোনো রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা দেননি। তিনি তাঁদের আত্মগোপনে যেতে বলেন এবং নিজে ধরা দেয়ার জন্য নিজ বাড়িতে অপেক্ষা করতে থাকলেন। কেবলমাত্র গনতন্ত্রহীনতাই পাকিস্তানকে দু’ভাগ করছে।

    শেখ মুজিব কী সত্যিই পাকিস্তান ভাঙ্গার পক্ষে ছিলেন?

    এবসোলেটলি না। পাঞ্জাবী নেতৃত্ব ও পাক-বাহিনী ২৫ মার্চের আগে সারা পূর্ব পাকিস্তানীদেরকে পিটাইয়া আওয়ামী লীগের দলে ভিড়াইয়া দিয়েছে। তাই ২৫ মার্চে আগে সারা পূর্ব পাকিস্তানিদের একজনও পাকিস্তান ভাঙ্গার পক্ষে ছিল না, এমনকি শেখ সাহেব নিজেও ( রাজনীতির তিনকাল, পৃষ্ঠা: ১০৩)। ৭ ই মার্চ ভাষণের পর, ২২ মার্চ ন্যাপ নেতা ওয়ালী খান বঙ্গবন্ধুকে জিঙ্গাস করেন, শেখ সাহেব, আমাকে বলুন, আপনি কী এখনও অখন্ড পাকিস্তানে বিশ্বাস করেন। শেখ মুজিব উত্তরে বলেন, আমি একজন মুসলিমলীগার। ২৮ ফেব্রুয়ারী জাতীয় পরিষদের অধিবেশনটি স্থগিতের কথা যখন পূর্ব পাকিস্তানের গর্ভনর আহসান এবং সামরিক প্রশাসক ইয়াকুব জানালেন, তার উত্তরে দলের ভেতরে স্বাধীনতাকামী অংশটিকে বশে আনতে নতুন একটি তারিখের কথা বললেন। গর্ভনরের অসামরিক বিষয়ের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীর মতে, এই একটি ঘটনা থেকেই আমার দৃঢ় বিশ্বাস হয়েছিল, শেখ মুজিব পাকিস্তান ভাঙ্গার পক্ষে ছিলেন না। যদি বিচ্ছিন্নতা চাইতেন তাহলে অধিবেশনের স্থগিতের ঘোষণাটিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করতে পারতেন। তা না করে একটা নতুন তারিখ কেন চাইতে যাবেন? সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ৭ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত কী কারনে তিনি ইয়াহিয়া, ভুট্টো ও টিক্কা খানদের সাথে আলোচনা অব্যাহত রাখেন? (ইতিহাসের বাঁকবদল, একাত্তর ও পঁচাত্তর, পৃষ্ঠা: ২০-২৩)। কারন শেখ মুজিব চেয়েছিলেন পরিপূর্ণভাবে গনতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ক্ষমতা হস্তান্তর করুক পাকিস্তান। তিনি পাকিস্তানের অখন্ডতা রক্ষার নানান ধরনের গঠনমূলক প্রস্তাবও দিয়েছিলেন। সবচেয়ে লক্ষনীয় এই যে, ঐ সময়ে সেনাবাহিনীর কারও সাথে তিনি সরাসরি যোগাযোগ করেননি, এমনকি সেনাবাহিনীর কাউকে স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রস্তুতিতেও উৎসাহিত করেন নাই। যাতে কেউ বলতে না পারে তিনি বিচ্ছিন্নতাবাদী (১৯৭১ ও আমার সামরিক জীবন, পৃষ্ঠা: ৮৪-৮৫)।

    পলাতক শেখ হাসিনা বলেছিলেন যে, তাঁর বাবা ৭ মার্চ প্রথম স্বাধীনতার ঘোষনা দেন

    এটা ডাহা মিথ্যা ইতিহাস। রাজনীতির তিনকাল বইয়ের ১০৫ নং পৃষ্ঠায় লেখক মিজানুর রহমান চৌধুরী উল্লেখ করেন যে ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে ৭ মার্চের ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ ঘোষণার পরের দিন যখন বিদেশী সাংবাদিকরা শেখ সাহেবকে তাঁর ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাসভবনে প্রশ্ন করে ‘আপনি উক্ত ঘোষণায় কী স্বাধীনতার যুদ্ধের ইঙ্গিত দিলেন, জবাবে তিনি বলেছিলেন ‘৭ মার্চের ঘোষণা আমাদের পলিটিক্যাল ইমানসিপেশন।’ শারমিন আহমদের লেখা (তাজউদ্দিন আহমদ: নেতা ও পিতা) বইয়ের ৪১ নং পৃষ্ঠায় বলা আছে যে, ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণটিতে সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়নি। হলে বঙ্গবন্ধু বক্তব্যের শেষে ‘জয় পাকিস্তান’ বলতেন না। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তমও ৭ মার্চের ঘোষণাকে স্বাধীনতা যুদ্ধের এক গ্রিন সিগন্যাল ছিল উল্লেখ করেছেন (একটি জাতির জন্ম, পৃষ্ঠা: ১২)।

    শেখ মুজিব কী আসলেই পাকিস্তানি আর্মির কাছে ধরা দেয়ার আগে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন?

    ২৫ মার্চ সন্ধ্যার একটু পরে একটি টেপ রের্কডার আর একটি স্বাধীনতার ঘোষণা পত্র নিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দিন আহমদ শেখ মুজিবের ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাসভবনে যান। উদ্দেশ্য ছিল শেখ মুজিবকে দিয়ে টেপে বিবৃতি অথবা স্বাধীনতার ঘোষণা পত্রে স্বাক্ষর নেয়া। দীর্ঘ দেড় ঘন্টা বুজানোর পরেও তিনি রাজি হননি, বরং বললেন ‘এটা আমার বিরুদ্ধে দলিল হয়ে থাকবে। এর জন্য পাকিস্তানীরা আমাকে দেশদ্রোহের জন্য বিচার করতে পারে।’ তাজউদ্দিন আহমদ দেখেন স্বেচ্ছাবন্দিত্ব গ্রহনে প্রস্তুতিমূলক বেগম ফজিলাতুননেছা সুটকেসে জামাকাপড় ভাঁজ করে ভড়ছেন এবং ঢোলা পায়জামার ফিতা ভরলেন (তাজউদ্দিন আহমদ, নেতা ও পিতা, পৃষ্ঠা: ৪৫)। শেখ মুজিব বিনা বাধায় বা স্বেচ্ছায় পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর কাছে ধরা দেন। পাকিস্তান রেডিও কর্তৃক প্রচারিত সংবাদে প্রচার করেন যে শেখ মুজিব ধরা দিয়েছেন (আমার-দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, পৃষ্ঠা: ৫৭০-৫৭৭)। তাজউদ্দিন আহমদ ৩ এপ্রিল ১৯৭১ রাতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাথে দেখা করলে, ইন্দিরা গান্ধী তাজউদ্দিন আহমদকে প্রশ্ন করেন, ‘হোয়াই ডিড শেখ মুজিব কোর্টেট অ্যারেস্ট?’ (১৯৭১- কলকাতা কোন্দল, পৃষ্ঠা: ১৯৩)।

    শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষক তার দাললিক প্রমান

    এক নজরে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সৈনিক জীবন:

    জন্ম: ১৯ জানুয়ারী ১৯৩৬ বগুড়া, পাকিস্তান আর্মির একাডেমীতে ক্যাডেট অফিসার হিসেবে যোগদান: ১৯৫৩, পাকিস্তান সামরিক বাহিনীতে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে যোগদান: ১৯৫৫, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে বদলি: ১৯৫৭, পাকিস্তান সামরিক গোয়েন্দা বিভাগে চাকুরীকাল: ১৯৫৯-১৯৬৪, পাক-ভারত যুদ্ধে আলফা কোম্পানীর ক্যাপ্টেন হিসেবে যুদ্ধে বিরুত্বপূর্ন অবদানের জন্য পাকিস্তান আর্মির সর্বোচ্চ খেতাব ‘হেলালে জুরুত’ লাভ: ১৯৬৫, পাকিস্তান সামরিক একাডেমীতে প্রশিক্ষক হিসেবে যোগদান: ১৯৬৬, ঢাকার জয়দেবপুরের ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের দ্বিতীয় ব্যাটালিয়নে সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে যোগদান: এপ্রিল ১৯৬৯, চট্রগ্রামের ষোলশহরে অবস্থিত ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অস্টম ব্যাটালিয়নে সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে যোগদান: ১৯৭০, তাঁর নেতৃত্বে সেনাবাহিনী ও ইপিআর জোয়ানরা বিদ্রোহ ঘোষণা করেন: ১৯৭১-এর ২৫ মার্চ দিবাগত মধ্যরাতের পর, ১ নং সেক্টরের সেক্টর প্রধান: জুন ১৯৭১ পর্যন্ত, জেড ফোর্সের প্রধান: জুলাই ১৯৭১ হতে, কর্নেল: ২৮ ফেব্রæয়ারী ১৯৭২, বিগ্রেডিয়ার জেনারেল: ৬ জুন ১৯৭২, মেজর জেনারেল: ১১ জুন ১৯৭৩, সেনাপ্রধান: ২৪ আগস্ট ১৯৭৫। এমন স্মোথ মেধা, দক্ষতা, যোগ্যতা, মন-মগজ-চরিত্র তাঁর সমকক্ষের সামরিক অফিসার বাংলাদেশে দ্বিতীয়টি ছিল কী? দেখুন তাঁর কোর্সমেট মেজর শফিউল্লাহ ফেইল করে এক বছর জুনিয়র হয়ে পড়েন। মেজর তাহের, খালেদ মোশারফ, শাফায়েত জামিলদের কথা নাই বলি!

    ২৫ মার্চ ‘৭১ কী ঘটল?

    আওয়ামী লীগের দলনেতা শেখ মুজিবুর রহমান নিজে ২৫ মার্চ রাত ১ টার দিকে আতœসমর্পন করে প্লেনে চড়ে চলে যান পাকিস্তানে। দলটির ‘হাই কমান্ড’-এর কাছেও কোনো রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা ছিল না। ছিল শুধু আত্মগোপনে চলে যাওয়ার মেসেজ। পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থানরত বাঙ্গালি আর্মি অফিসারদের কাছেও কোন প্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থার মেসেজ ছিল না। এদিকে পাকিস্তানি সেনার গাড়িগুলো ‘অপারেশন সার্চ লাইট’-এর আওতায় ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়, পিলখানা, রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সকে টার্গেট করে এগিয়ে আসছে, আর সামনে যাকে পাচ্ছে তাকেই হত্যা করছে। চট্রগ্রামেও চলছে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ। এমন পরিস্থিতিতে জাতি যখন দিশেহারা, তখন দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য নেতৃত্বহীন জাতির দিশারী হয়ে মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী থেকে বিদ্রোহ করেন সাহসী বীর তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান।

    শহীদ জিয়ার প্রথম দূরদর্শী উক্তি ‘উই রিভোল্ট’

    যখন পাকিস্তান হানাদার বাহিনী ২৫ মার্চ নেতৃত্বশূন্য নিরস্ত্র অসহায় ঘুমন্ত বাঙ্গালী জাতির উপর তার পুরো সামরিক সরঞ্জামে সজ্জিত সামরিক বাহিনী নিয়ে অতর্কিত ঝাপিয়ে পড়ল, মেজর জিয়াউর রহমান তখন চট্রগ্রামের ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সহকারী কমান্ডিং অফিসার হিসেবে দায়িত্বরত। মেজর জিয়ার কমান্ডিং বস পাকিস্তানী আর্মি অফিসার লে. কর্নেল জানজুয়া ২৫ মার্চ রাত আনুমানিক ১১ টায় চট্রগ্রাম বন্দরে নোঙ্গর করা পাকিস্তানী অস্ত্রের জাহাজ ‘সোয়াত’ থেকে অস্ত্রশস্ত্র খালাস তদারকি করার জন্য তাঁকে নির্দেশ দেন। তিনি ২ জন পাকিস্তানী অফিসার সাথে নিয়ে নৌবাহিনীর একটি ট্রাকে রওনা দেন। আগ্রাবাদে এসে ট্রাকটি যখনই ব্যারিকেডে থেমে গেল, তখনই অন্যপ্রান্ত হতে মেজর খালিকুজ্জামান জিয়াউর রহমানের কাছে এসে জানালেন পাকিস্তানীরা ক্যান্টনমেন্টে থাকা বাঙ্গালী সৈনিক ও অফিসারদের উপর হামলা করছে। সাথে সাথে তিনি ‘ডব ৎবাড়ষঃ’ বলে তাঁর সাথে থাকা অফিসার দু’জনকে নিরস্ত্র করলেন। সেই মুহূর্তে বেগম খালেদা জিয়া চট্রগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে তাঁর অবুঝ শিশুপুত্র (আরাফাত রহমান ১ বছর ৫ মাস ও তারেক রহমান ৫ বছর) নিয়ে একা ছিলেন। ঔ সময় সেনানিবাসে থাকা বাঙ্গালী সৈনিকেরা ম্যাডাম জিয়ার কাছে বলল “পাকিস্তানী অফিসার আমাদের অস্ত্র সারেন্ডার করার নির্দেশ দিয়েছে, আমাদের কমান্ডার (মেজর জিয়া) তো ক্যান্টনমেন্টে নেই, আমরা এখন কী করব?’’ খালেদা জিয়া তখন তাদেরকে বললেন “তোমাদের কমান্ডার না আসা পর্যন্ত একটা অস্ত্রও সমর্পণ করবে না”। তাই হলো মেজর জিয়া ক্যান্টনমেন্টে ব্যাক করলেন এবং সকল বাঙ্গালী অফিসার ও সৈনিকদের সাথে নিয়ে তাঁর কমান্ডিং অফিসার কর্নেল জানজুয়াকে হত্যা করে পুরো সেনানিবাসের দায়িত্ব নেন।

    জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণার স্বপক্ষে প্রমান সমূহ

    জিয়াউর রহমান তাঁর নিজের লেখা ‘একটি জাতির জন্ম’ শীর্ষক কলামটি যা ’৭২ সালে দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত হয়েছিল সেখানে নিজের উপলব্দি এভাবে ফুটিয়ে তুলেন ‘তখন রাত ২টা বেজে ১৫ মিনিট। ২৬ মার্চ দিবাগত রাত। ১৯৭১ সাল। রক্তের অক্ষরে বাঙালির হৃদয়ে লেখা একটি দিন। বাংলাদেশের জনগন চিরদিন স্মরণ রাখবে এই দিনটিকে। স্মরণ রাখতে ভালোবাসবে। এই দিনটিকে তারা কোনো দিন ভুলবে না। কোনো দিন না।’ এই ছোট্ট ¯øটে তিনিই যে স্বাধীনতার ষোষক তা বুঝতে রকেট সায়েন্টিস্ট হতে হয় না। আচ্ছা! ১৯৭৫-১৯৮১ সালের ভেতর জিয়াউর রহমানের হাতে স্থাপিত কয়টি ভিত্তি প্রস্তরে তাঁর নাম লেখা দেখাতে পারবেন? তাঁর ব্যাচমেট ও ৩ নং সেক্টর কমান্ডার মেজর শফিউল্লাহ তাঁর (ইধহমষধফবংয ধঃ ডধৎ, অপধফবসরপ চঁনষরংযবৎং, উযধশধ, ১৯৮৯) বইয়ের ৪৪-৪৫ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন, ‘মেজর জিয়া ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে পাকিস্তানি আর্মিকে মোকাবেলা করার জন্য সবাইকে আহবান জানান। তিনি সেদিন ‘হেড অব দি স্টেট’ ও বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।’ ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের মেজর জিয়া খান ২৬ তারিখে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং তিনি বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্বও গ্রহন করেন (ভারত রক্ষক ম্যাগাজিন, পৃষ্ঠা: ৯৩)। মুক্তিযুদ্ধের ১ নং সেক্টর কমান্ডার (১১ জুন হতে ১৬ ডিসেম্ভর) ও আওয়ামী লীগের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মেজর রফিক-উল ইসলাম তাঁর ‘অ ঃধষব ড়ভ গরষষরড়হ’ বইয়ের ১০৫-১০৬ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, ‘মেজর জিয়া ২৭ মার্চের সন্ধ্যায় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন।’ মেজর সুবিদ আলী ভঁ‚ইয়া তাঁর ‘মুক্তিযুদ্ধে নয় মাস’ বইয়ের ৫৩ পৃষ্ঠায় লিখেছেন ‘২৬ মার্চ মেজর জিয়া হেড অব দি স্টেট হিসেবেই স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান করেন।’ আমীন আহম্মেদ চৌধুরী তাঁর ‘১৯৭১ ও আমার সামরিক জীবন’ বইয়ের ৪৪ নং পৃষ্ঠায় লিখেছেন ‘মেজর জিয়াউর রহমান ২৭ মার্চ সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিটে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা দিলেন। বিসমিল্লাহির রাহমানির রহিম। প্রিয় দেশবাসী, আমি মেজর জিয়া বলছি। বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও লিবারেশন আর্মির চিফ হিসেবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি এবং যুদ্ধে অংশগ্রহনের জন্য আবেদন জানাচ্ছি।’ ১৯৭১ সালে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও পরবর্তীতে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ ১১ এপ্রিল ১৯৭১ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র হতে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে বলেন ‘মেজর জিয়াই প্রথম বাংলাদেশের পক্ষে স্বাধীনতা ঘোষণা দেন (ইধহমষধফবংয ফড়পঁসবহঃং, ঠড়ষ-১, ওহফরধহ এড়াবৎহসবহঃ, ঢ়ধমব- ২৮৪)।’ এনসিটিবি ২০২৪-২০২৫ শিক্ষাবর্ষের সকল শ্রেণীর বইগুলোতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নির্ভর অংশে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে জিয়াউর রহমানের নাম যুক্ত করেছে। যেখানে মুক্তিযুদ্ধের পটভ‚মিতে ২৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা করেন মেজর জিয়াউর রহমান। এমন বক্তব্যকে পরিবর্তন করে ২৬ শে মার্চ মেজর জিয়াউর রহমান প্রথমবার নিজেই কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। পরের দিন ২৭ শে মার্চ তিনি শেখ মুজিবের পক্ষে পুনরায় স্বাধীনতার ঘোষণা দেন বলে উল্লেখ করা হয়। উপসংহারে বলতে হয়, দুনিয়ার জগন্যতম গনহত্যা ও গৃহযুদ্ধ পরিচালনাকারী পাকিস্তানি শাসক এবং পূর্ব পাকিস্তানের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান বরাবরই আত্মপ্রতারণার মধ্যে বাস করেছে। নিজেদের ভুল নীতির কারনে যেসব সমস্যা তৈরি হয়েছে, সেগুলোর জন্য অদ্যাবদি কেহই দ্বায় স্বীকার করেনি। নিজেদের ভুল স্বীকার করাটাই তাদের কাছে ভয়ানক দুর্বলতা বলে মনে হয়। অথচ একজন সত্যিকার দেশপ্রেমিক যুদ্ধা যিনি নিজে জীবন বাজি রেখে স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেন, রনাঙ্গণে উপস্থিত থেকে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিলেন, যুদ্ধা তৈরিতে জেড ফোর্সের দায়িত্ব নিলেন, দেশমাতৃকার বিজয় অর্জন করালেন, অথচ কোনোদিন নিজে ক্রেডিট নিতে বলেননি আমিই স্বাধীনতার ঘোষক। শুধু ইঙ্গিত রেখেছিলেন তাঁর লেখা ‘একটি জাতির জন্ম’ প্রবন্ধে যে ‘২৬ মার্চ’ দিনটিতে জাতি আমায় স্মরণ রাখবে। স্বাধীনতা ঘোষণার সত্যিকার ইতিহাস এইটুকুই!

    লেখক: গবেষক ও অধ্যাপক, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ।

     
    Category: #ঘোষণা