
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনায় অভিষিক্ত হয়েই শাসকগোষ্ঠির রেখে যাওয়া ধ্বংসপ্রাপ্ত ও বিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে অত্যন্ত সাহসী, সময়োপযোগী বাস্তবভিত্তিক উন্নয়ন কৌশল, নীতি, কর্মসূচি ও পরিকল্পনা গ্রহণ করেন যা দেশের কৃষির আধুনিকায়ন,উন্নয়ন ও রূপান্তরকে ত্বরান্বিত করেছে-
জাতীয় বীজ অধ্যাদেশ প্রণয়ন
‘ভাল বীজে ভাল ফসল’-এটি রাষ্ট্রপতি জিয়া একজন বিজ্ঞানীর মতই অনুধাবন করতেন এজন্য ১৯৭৭ সালের জুলাই মাসে তিয়ি বীজ অধ্যাদেশ প্রণয়ন করেন । কৃষকরা বাজার থেকে বীজ কিনে যেন প্রতারিত না হয় , বীজের উৎপাদন থেকে বিপনন পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে ব্যক্তি খাতের অংশগ্রহণের সুযোগ প্রদানের মাধ্যমে মানসম্পন্ন বীজ কৃষকের হাতে পৌঁছিয়ে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি করাই ছিল এর লক্ষ্য। এই বীজ অধ্যাদেশই বাংলাদেশের বীজ শিল্পের বিকাশ ও উন্নয়নের মাইল ফলক।
কৃষি সংস্কার কর্মসূচি
জিয়া কৃষির আধুনিকায়ন ও উন্নয়নের জন্য সার, কীটনাশক, কৃষি যন্ত্রপাতি ও উন্নত প্রযুক্তি কৃষকের হাতে দ্রুত পৌঁছানো ও সম্প্রসারণের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে কৃষিতে ব্যাপক সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করেন। তিনি কৃষি উপকরণ সংগ্রহ, বিতরণ ও ব্যবসায় উদারীকরণ নীতি গ্রহণ করে বেসরকারি খাতকে যুক্ত করে্। এই সংস্কারের কারনে উপকরণ ও প্রযুক্তি কৃষকদের মাঝে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ফলে ১৯৭৪-৭৫ সালে বাংলাদেশের ধান উৎপাদন ১১.১১ মিলিয়ন টন থেকে ১৯৮০-৮১ সালে বেড়ে দাড়ায় ১৩.৬৬ মিলিয়ন টন।
খাদ্য গুদাম নির্মাণ কর্মসূচি
কৃষকদের উৎপাদিত অতিরিক্ত ফসল গুদামজাত করে আপদকালীন মজুদ গড়ে তোলা এবং প্রয়োজনের সময় খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থার মাধ্যমে খাদ্য সরবরাহ করে মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জিয়া নতুন খাদ্য গুদাম নির্মাণের কর্মসূচি গ্রহণ করেন।
খাদ্যশস্য সংগ্রহ অভিযান জোরদারকরণ কর্মসূচি
শস্য উৎপাদনে উৎসাহিত করতে জিয়া কৃষকদের কাছ থেকে লাভজনক দামে সরাসরি ধান-চাল ক্রয়ের নীতি গ্রহণ করেন। ফলে ১৯৮০-৮১ সালে ধান-চাল সংগ্রহ অভিযানে রেকর্ড পরিমাণ (১.০৩ মি. টন) চাল সংগ্রহ করা হয়। তাঁর শাসনামলেই বাংলাদেশ থেকে প্রথম চাল রপ্তানি করা হয়।
খোলা বাজারে খাদ্য পণ্যের বিক্রয় কর্মসূচি (OMS)
বাজারে খাদ্য পণ্যের মূল্যস্ফীতির সময় নিম্ন আয়ের মানুষেরা যেন সহজেই খাদ্য পণ্য ক্রয় করে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে সে উদ্দেশ্যে জিয়া OMS ব্যবস্থা চালু করেন। যা বর্তমানে সমাদৃত একটি কর্মসূচি।
খাল খনন কর্মসূচি
সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন, সহজলভ্য এবং টেকসই করার জন্য জিয়া ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী ‘খাল খনন’ কর্মসূচি গ্রহণ করেন । শুকনো মৌসুমে কৃষক ভূ-উপরিস্থ পানি দিয়ে জমিতে সেচের ব্যবস্থা করে ফসলের নিবীড়তা বাড়ানো, বর্ষা মৌসুমে ফসলকে বন্যা থেকে রক্ষা করা, খননকৃত খালে মাছ চাষ করে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করা ও প্রাকৃতিক পরিবেশকে প্রাণিকূল এবং ফসলের জন্য অনুকূল রাখাই ছিল এ কর্মসূচির মূল লক্ষ্য । সারাদেশে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে দেড় বছরে ১৫০০ এর বেশী খাল খনন ও পূনঃখনণে জনগণের সাথে তিনি নিজেও অংশ নিয়েছেন। খাল খনন কর্মসূচী ছিল এদেশের কৃষকের জন্য বড় আশীর্বাদ। বর্তমানে দেশের জনগন এই কর্মসূচির প্রয়োজন ব্যাপকভাবে অনুভব করছে।
শস্য গুদাম ঋণ কর্মসূচি
কৃষকরা উৎপাদিত ফসল গুদামে মজুদ রেখে স্বল্প সুদে ঋণ গ্রহণ করে তার তাৎক্ষনিক প্রয়োজন মেটাতে পারে এবং মৌসুম শেষে গুদামজাত শস্য বেশী দামে বিক্রি করে যেন আর্থিকভাবে লাভবান হয় সেজন্য জিয়া ১৯৭৮ সালে শস্য গুদাম ঋণ কর্মসূচি গ্রহণ করেন।
বিশেষ কৃষিঋণ কর্মসূচি
ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা কৃষিকাজের জন্য জামানত ছাড়াই স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধা পেয়ে দেশের কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে অবদান রাখতে পারে সে লক্ষ্যে তিনি ১৯৭৭ সালে ১০০ কোটি টাকার বিশেষ কৃষিঋণ কর্মসূচী প্রনয়ণ করেন যা বাংলাদেশের কৃষিঋণ প্রবাহে নতুন মাত্রা যোগ করে।
পল্লী বিদ্যুতায়ন কর্মসূচি
বিদ্যুৎ ব্যবহারের মধ্য দিয়ে কৃষি ও শিল্পের উন্নয়ন এবং গ্রামীণ এলাকায় অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের সম্প্রসারণের মাধ্যমে পল্লীর জনগণের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে ১৯৭৭ সালের অক্টোবর মাসে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট জিয়া পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড প্রতিষ্ঠা করেন যা তৃতীয় বিশ্বের জন্য অন্যতম একটি সফল ঘটনা।
যুব উন্নয়ন কর্মসুচি
দেশের বেকার যুব সমাজকে উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার লক্ষ্যে জিয়া ১৯৭৮ সালে যুব মন্ত্রণালয় ও ১৯৮১ সালে যুব উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। এ কর্মসূচির প্রধান লক্ষ্য পোল্ট্রি, মাৎস্য, ডেইরি, কৃষি ও আয়বর্ধনমূলক কর্মকান্ড বিষয়ক প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে বেকারদের আত্নকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে দারিদ্র বিমোচন এবং দেশের উৎপাদন বৃদ্ধি করা। এই কর্মসূচি দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
বিসিআইসি প্রতিষ্ঠা ও সার কারখানা নির্মাণ
দেশে সারের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটানোর জন্য জিয়া ১৯৭৬ সালে বিসিআইসি প্রতিষ্ঠা করেন এবং নতুন সার কারখানা স্থাপনের কর্মসূচি গ্রহণ করেন। ১৯৮১ সালে তিনি আশুগঞ্জ সার কারখানা প্রতিষ্ঠা করেন।
চিনি ও চা শিল্পের উন্নয়নে নীতিমালা
চিনির আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে দেশে চিনি ও এর উপজাতভিত্তিক পন্য উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে চিনি শিল্পকে শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড় করার জন্য জিয়া ১ জুলাই ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ সুগার অ্যান্ড ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরশেন গঠন করেন। বাংলাদেশের চা শিল্পের উন্নয়নের জন্য জিয়া ১৯৭৭ সালে চা অধ্যাদেশ জারী করেন এবং চা বোর্ড প্রতিষ্ঠা করেন।
কৃষি গবেষণায় গুরুত্বারোপ ও স্বায়ত্বশাসন
জিয়ার বিশেষ আগ্রহ ও প্রচেষ্টায় ‘বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট’,গাজীপুর, ১৯৭৬ সালে Presidential Order এর বলে স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসাবে আত্নপ্রকাশ করে যা বর্তমানে বিভিন্ন ফসলের জাত ও প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও উন্নয়নে কাজ করছে। তিনি ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ অনান্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানে নতুন বিভাগ ও কেন্দ্র চালু করেন।
গম গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা
জিয়া গমের আমদানী নির্ভরতা কমিয়ে দেশে গমের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে ১৯৮০ সালের জুলাই মাসে নশিপুর, দিনাজপুরে গম গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন যা বর্তমানে বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইন্সটিটিউট হিসেবে পরিচিত।
বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমীর (বার্ড) শক্তিশালীকরন
‘পল্লীর উন্নয়ন বাদ দিয়ে দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়’ কথাটি জিয়া মনেপ্রানে বিশ্বাস করতেন। একারনে বার্ড, কুমিল্লাকে আরও শক্তিশালী করতে তিনি বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করেন।
পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (আরডিএ) বগুড়ার আধুনিকায়ন ও উন্নয়ন
আরডিএকে- বার্ড এর আদলে কিভাবে নতুনরূপে প্রতিষ্ঠা করা যায় সেজন্য তিনি বার্ড এর প্রতিষ্ঠাতা ড. আখতার হামিদ খানকে যুক্তরাষ্ট্র হতে বাংলাদেশে এনে আরডিএ তে বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিয়োগ দেন। ১৯৮০ সালে জিয়ার ঐকান্তিক আগ্রহে বগুড়া শহর থেকে শেরপুরে ১২০ একর জমিতে গড়ে উঠে আরডিএ এর নিজস্ব আধুনিক ভবন।
আন্তর্জাতিক পল্লী উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান স্থাপন
জিয়ার প্রচেষ্টায় ১৯৭৯ সালে ঢাকায় আন্তর্জাতিক মানের একটি পল্লী উন্নয়ন সংস্থা-CIRDAP প্রতিষ্ঠিত হয় যেটি এ অঞ্চলের পল্লী জনগণের জীবন যাত্রার মান উন্নয়নে কাজ করছে।
অত্যন্ত সৎ, নির্লোভ ও দূরদর্শী এ রাষ্ট্রনায়কের ডাকে জনগণ সাড়া দিয়েছিল ব্যাপকভাবে । রাখাল প্রেসিডেন্ট জিয়ার যাদুর হাতের স্পর্শে তলাবিহীন ঝুড়ি খ্যাত খাদ্য ঘাটতির দেশ পরিণত হয় খাদ্যে উদ্বৃত্ত স্বনির্ভর বাংলাদেশে। ‘স্বাধীনতার’ পর বাংলাদেশের অন্যতম বড় অর্জন ‘কৃষির উন্নয়ন’। জিয়া মহান মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা দিয়ে যেমন ইতিহাস হয়ে আছেন তেমনি বাংলাদেশের কৃষি বিপ্লবের মাধ্যমে কৃষকের মাঝে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। নোবেলজয়ী কৃষি বিজ্ঞানী ড. নরমান. বোরলোগ পশ্চিমা বিশ্বে, ভারতে সোয়ামিনাথান সবুজ বিপ্লবের জনক হিসেবে পরিচিত, ঠিক তেমনি বাংলাদেশে সবুজ বিপ্লবের জনক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান।
লেখক: শিক্ষক ও গবেষক, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ